ফুটবল কখনো কখনো খেলার সীমানা ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে আবেগ, স্বপ্ন আর বিস্ময়ের এক অনন্য ক্যানভাস। সেই ক্যানভাসে লিওনেল মেসি এঁকেছেন এমন এক মহাকাব্য, যার প্রতিটি অধ্যায় লেখা হয়েছে বাঁ পায়ের জাদুতে। তাঁর পায়ে বল মানেই বদলে যেত মাঠের ছন্দ, থমকে যেত প্রতিপক্ষের রক্ষণ, আর গ্যালারিতে জেগে উঠত লাখো মানুষের উচ্ছ্বাস। নিখুঁত শট, চোখ ধাঁধানো ড্রিবলিং, অবিশ্বাস্য পাস আর মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে মেসি শুধু ফুটবল খেলেননি, ফুটবলকে রূপ দিয়েছেন এক অনন্য শিল্পে। আর সেই শিল্পের পথ ধরেই তিনি উঠে এসেছেন ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে।
তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অগণিত স্মৃতি ও গল্প। কারও কাছে তিনি ফুটবলের শিল্পী, কারও কাছে শৈশবের নায়ক, আবার কারও কাছে অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রতিচ্ছবি। তাই মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, আধুনিক ফুটবলের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
আর সেই কিংবদন্তির আর্জেন্টিনা অধ্যায়ে এবার নামছে পর্দা।
৩১ আগস্ট ২০২৬, ৩৯ বছর বয়সে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন মেসি। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়ের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের ইতি টানলেন তিনি। তবে ফুটবল থেকে পুরোপুরি বিদায় নয়; ক্লাব ফুটবলে তাঁর পথচলা এখনো অব্যাহত।

রোজারিও থেকে বিশ্বমঞ্চে
১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম লিওনেল আন্দ্রেস মেসির। শৈশবেই ফুটবলে তাঁর প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। শারীরিক বৃদ্ধিজনিত সমস্যার চিকিৎসার জন্য অল্প বয়সে পাড়ি জমান স্পেনে। বার্সেলোনার যুব একাডেমি লা মাসিয়ায় শুরু হয় তাঁর বিশ্বজয়ের পথচলা।
বার্সেলোনার হয়ে একের পর এক সাফল্যে তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা। তবে জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর পথ ছিল অনেক কঠিন।
অপেক্ষা, হতাশা ও প্রত্যাবর্তন
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির আন্তর্জাতিক পথচলা শুরু ২০০৫ সালে। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানি এবং ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে পরাজয় তাঁকে গভীরভাবে হতাশ করে। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। পরে ফিরে আসেন জাতীয় দলে।
আর সেই প্রত্যাবর্তনই বদলে দেয় তাঁর গল্প।
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা পান মেসি। এরপর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে হারিয়ে হাতে তোলেন বহু কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ ট্রফি। ২০২৪ সালে আবারও আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকার শিরোপা এনে দেন তিনি।
একসময় জাতীয় দলের ব্যর্থতার জন্য সমালোচিত মেসিই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম সফল অধিনায়ক।
শেষ বিশ্বকাপ
২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনা পৌঁছেছিল ফাইনালে। কিন্তু শিরোপার লড়াইয়ে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় তারা।
স্বপ্নের মতো আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে বিদায় নেওয়া হয়নি মেসির। তবু ২০২২ বিশ্বকাপ এবং ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকাসহ তাঁর আন্তর্জাতিক অর্জন তাঁকে ইতোমধ্যেই অমর করে দিয়েছে।

সংখ্যায় মেসি
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি খেলেছেন ২০৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং করেছেন ১২৫ গোল—দুটিই দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অংশ নিয়েছেন ছয়টি বিশ্বকাপে।
ব্যক্তিগত অর্জনেও তিনি অনন্য। আটবার ব্যালন ডি’অর জয় তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম বড় স্বীকৃতি।
একজন মেসি, অসংখ্য স্মৃতি
মেসির বিদায় শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়; এটি একটি প্রজন্মের অসংখ্য স্মৃতির বিদায়।
কারও কাছে তিনি বার্সেলোনার জাদুকর, কারও কাছে ২০১৪ বিশ্বকাপের অধিনায়ক, কারও কাছে ২০২১ কোপা আমেরিকার কান্নাভেজা আনন্দ। আবার কারও কাছে তিনি কাতারের সেই মেসি, যিনি বহু বছরের অপেক্ষার পর বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে তুলেছিলেন।
আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে তিনি শুধু ‘লিও’ নন; তিনি স্বপ্ন, অপেক্ষা, কান্না এবং শেষ পর্যন্ত গর্বের একটি নাম।

বিদায় নয়, উত্তরাধিকার
মেসি চলে যাচ্ছেন আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সি থেকে। কিন্তু ফুটবল থেকে তাঁর গল্প শেষ হচ্ছে না। হয়তো আর কোনো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিতে তাঁকে দেখা যাবে না। আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কোটি দর্শক অপেক্ষা করবে না তাঁর বাঁ পায়ের জাদুর জন্য।
তবু মেসি থাকবেন অসংখ্য গোল, ট্রফি, অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং, নিখুঁত পাস এবং কোটি মানুষের ভালোবাসায়।
কিংবদন্তিদের বিদায় হয়, কিন্তু কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্পের বিদায় হয় না।
বিদায়, লিওনেল মেসি।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে তোমার গল্প শেষ, কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে তোমার অধ্যায় চিরকাল অমলিন।





