২০১১ সালের ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর প্রায় ১৫ বছর বন্ধ থাকার পর বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কাশিওয়াজাকি-কারিওয়ার একটি রিঅ্যাক্টর পুনরায় চালু হয়েছে। টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (টেপকো) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
নিগাতা প্রদেশে জাপান সাগরের তীরে অবস্থিত এই কেন্দ্রটির মোট সাতটি রিঅ্যাক্টরের মধ্যে ইউনিট-৬ বুধবার সন্ধ্যা ৭টা ২ মিনিটে (স্থানীয় সময়) নিয়ন্ত্রণ রড সরিয়ে চালু করা হয়। পুরোপুরি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে। এটি টেপকোর পরিচালিত প্রথম রিঅ্যাক্টর, যা ২০১১-এর পর পুনরায় চালু হলো।
কেন্দ্রটির সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষমতা ৮.২ গিগাওয়াট, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড়। তবে বর্তমানে শুধু একটি রিঅ্যাক্টর (১.৩৬ গিগাওয়াট) চালু হচ্ছে, যা টোকিও অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রায় ২ শতাংশ বাড়াতে পারে।
২০১১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির পর ফুকুশিমা দাইইচি কেন্দ্রে তিনটি রিঅ্যাক্টর গলে যাওয়ায় জাপান সব পারমাণবিক কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়। কাশিওয়াজাকি-কারিওয়াও তখন থেকে বন্ধ ছিল। ফুকুশিমা-পরবর্তী কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে এখন পর্যন্ত জাপানে ১৫টি রিঅ্যাক্টর পুনরায় চালু হয়েছে।
জাপান জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে, ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জন এবং এআই-সংশ্লিষ্ট বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে পারমাণবিক শক্তির দিকে ফিরছে। ২০২৩ সালে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ এসেছে কয়লা, গ্যাস ও তেল থেকে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ে ২০৪০ সাল নাগাদ পারমাণবিক শক্তি মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যোগান দেবে (বর্তমানে প্রায় ৮.৫ শতাংশ)।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি পারমাণবিক জ্বালানির পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। গত বছরের এক জরিপে প্রায় ৬০ শতাংশ বাসিন্দা পুনরায় চালুর বিপক্ষে ছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ইউমিকো আবে (৭৩) বলেন, “বিদ্যুৎ যায় টোকিওতে, কিন্তু ঝুঁকি নিতে হয় আমাদের। এতে কোনো যুক্তি নেই।” আরেক বিক্ষোভকারী কেইসুকে আবে (৮১) বলেন, “ফুকুশিমার পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। টেপকো আবার চালু করতে চায়—এটা গ্রহণযোগ্য নয়।”
কেন্দ্রে ১৫ মিটার উঁচু সুনামি প্রতিরোধ দেয়াল, উঁচুতে জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও অন্যান্য নিরাপত্তা উন্নয়ন করা হয়েছে। তবে বাসিন্দারা ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান, তথ্য গোপনের অভিযোগ ও অপর্যাপ্ত সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
গত ৮ জানুয়ারি ৪০ হাজারের বেশি স্বাক্ষরসহ পিটিশন জমা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কেন্দ্রটি সক্রিয় ভূমিকম্প ফল্টের কাছে এবং ২০০৭ সালেও শক্তিশালী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের পারমাণবিক খাতে কয়েকটি কেলেঙ্কারি ঘটেছে, যার মধ্যে তথ্য জালিয়াতি ও অ্যালার্ম ব্যর্থতা রয়েছে। টেপকো প্রেসিডেন্ট তোমোআকি কোবায়াকাওয়া বলেন, “নিরাপত্তা একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমাদের কখনো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়া চলবে না।”
ফুকুশিমা কেন্দ্রের সম্পূর্ণ বন্ধ করার কাজ এখনও চলছে, যা কয়েক দশক লাগতে পারে। জাপান এখন পারমাণবিক শক্তির পুনরুজ্জীবনের পথে, কিন্তু ফুকুশিমার স্মৃতি এখনও জীবন্ত।
তথ্যসূত্র ঃ অনলাইন




