বই মানুষের মনের ও জ্ঞানের বিকাশ ঘটায়। কথায় আছে বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না। বই মানুষকে আত্ম তৃপ্তিতে উজ্জবিত করতে সহায়তা করে। আফ্রিকার দেশ মরক্কোতে একটি প্রবাদ আছে- ‘বই ছাড়া একজন জ্ঞানী ব্যক্তি হচ্ছেন যন্ত্রপাতি ছাড়া কারিগরের মতো’।
গত কয়েক শতক ধরে তাই জ্ঞানের সন্ধানে দেশটির ফেজ নগরীর প্রাচীন পাঠাগার আল কারাউইনে ভীড় করতেন জ্ঞানী-গুণীরা। এটি মূলত আল কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার। একই নামে পরিচিত। এখানে আছে ইসলামি শিল্পকলা এবং বিজ্ঞানের অগ্রগামী দেশ মরক্কোর অতীত সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য।

তবে দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষজ্ঞ, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয়রা এর থেকে দূরে ছিলেন। আল কারাউইন পাঠাগারের বয়স ফেজ শহরের চেয়ে মাত্র ৩০ বছর কম। শহরের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত এই পাঠাগার। গিনেজ বুকের তথ্য মতে, বর্তমানে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সবচে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় আল কারাউন।
৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে আরবের ধনী নারী ফাতেমা আল ফিহরির পৃষ্ঠপোষকতায় এই বিশ্ববিদ্যালয়টি নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৩৫৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চালু ছিল এর পাঠাগারটি। ইসলামের প্রথম যুগের নানা পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় এই পাঠাগারে। এর মধ্যে আছে, নবম শতকের একটি কোরান এবং দশম শতকে লিখিত মোহাম্মদ (স.) এর জীবনীর বিভিন্ন অংশ। এছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিজ্ঞানের ওপর বই আছে এখানে।
কয়েক প্রজন্ম ধরে পাঠাগারের রক্ষীরা এসব মূল্যবান তথ্য-উপাত্ত তালাবদ্ধ করে রেখেছেন। বিভিন্ন সময়ের যুদ্ধে উপনিবেশবাদীদের দখল-বেদখলের ঘটনায় ফেজ শহর আঘাতপ্রাপ্ত হলেও আল কারাউইন মোটামুটি অক্ষতই ছিল। তবে সমস্যা তৈরি হয়েছে অন্যভাবে। পাঠাগারের পাশেই আছে একটি মসজিদ। ওই মসজিদের ছাদের ওপর পড়া বৃষ্টির পানি পাঠাগারটিতে প্রবেশ করে এর কয়েক শতক ধরে এর ক্ষতি করেছে। এরই মধ্যে হঠাৎ করে আল কারাউইনের পাটাতনের নিচ দিয়ে ধীরে ধীরে পানির স্রোত বইতে শুরু করে। এতে বিপদে পড়ে পাঠাগারের কাঠামো।
ফেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক মোহা এন্নাজি বলেন, ‘ফেজ শহর সব সময়ই শিক্ষাদীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। বিশেষ করে ইসলামি শিক্ষার ক্ষেত্রে।’ কিন্তু এর সুন্দর জিনিসগুলো এখন দৈন্যদশায় পড়েছে। এ অবস্থায় আল কারাউইন পাঠাগারকে বাঁচাতে নতুন পদক্ষেপ নেয় মরক্কোর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। পাঠাগারটিকে পুনরায় চালু করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে তারা নিয়োগ দেয় আজিজা চাউনি এবং তার স্থাপত্যদলকে।

প্রকৌশলীরা ভবনের ভিত্তি পুনরায় স্থাপন করেছেন, সেখানে নতুন করে পানি নিষ্কাষণ ব্যবস্থা চালু করেছেন এবং ভবনের সবুজ রঙের ছাদের প্রতিটি টাইল আগের মতো করে তৈরি করেছেন। সম্ভবত গত কয়েকশ বছর ধরে ভবনটি লুকিয়ে রেখেছিল নিজের অনেক গোপন সৌন্দর্য।
চাউনি বলেন, ‘দেয়ালে কাজ করার সময় আমরা অনেক নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করছিলাম।’ এর মধ্যে ছিল মসজিদ এবং পাঠাগারকে সংযুক্ত করা একটি দরজা। এটি ষোল শতকের একটি গম্বুজের ভেতর লুকানো ছিল।
তবে ভবনটিতে কিছু আধুনিকতার ছোঁয়াও লাগানো হয়েছে। নতুন লাইট, তাপনিয়ন্ত্রক যন্ত্রসহ আরো কিছু জিনিস সংযুক্ত করা হয়েছে ভবনে। এছাড়া পুরনো পাণ্ডুলিপিগুলো সংরক্ষণের জন্য তৈরি করা হয়েছে একটি গবেষণাগার।
এন্নাজি বলেন, ‘পাঠাগার কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি এগুলো স্ক্যান করা এবং ডিজিটাল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতের জন্য ডিস্কে সংরক্ষণ করা যায়। পাণ্ডুলিপিগুলো অনেক পুরনো। এগুলো এখন ব্যবহার করতে গিয়ে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এজন্য আমরা অত্যন্ত সতর্ক।’

তবে গত পাঁচ বছর ধরে আল কারাউইনের কাজ চললেও এখনো এটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। এখনো নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না, ফেজ এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের অপেক্ষমাণ মানুষেরা কখন এই প্রাচীন পাঠাগারটিতে আবারো পড়াশুনা শুরু করতে পারবে।
পাঠাগারের প্রধান আবদেল ফাত্তাহ বোগচফ বলেন, ‘প্রতিদিনই গবেষকরা আসে, এটাকে বন্ধ দেখে। যত দ্রুত আমরা পাঠাগারটি খুলে দিতে পারবো ততই মঙ্গল। যত তাড়াতাড়ি এটা করতে পারবো, ততই ভালো লাগবে।’
আল কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারটি খুলে দিতে পারলে ফেজ শহরটিও লাভবান হবে। এটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা অন্যতম শহর। এখানে ভীড় করবে দর্শনার্থীরা।



